সভ্যতা কী?
“সোনারগাঁও পাঠচক্র”-এর ১১ তম চক্র অনুষ্ঠিত হয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নলেজ ভ্যালি প্রাঙ্গণে। হাসিফুল ইসলাম তামজিদ-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই চক্রের আলোচক ছিলেন তরুণ গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট শফিকুল ইসলাম। তিনি পূর্বনির্ধারিত আলোচ্য বিষয় “নদী ও নগর সম্পর্ক; ঢাকার নদীসংকটের একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ”-এর উপর আলোচনা করেন। মূল আলোচনার পাশাপাশি শুভেচ্ছা বক্তব্য পেশ করেন– অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গবেষক ও অনুবাদক জনাব মুশফিকুর রহমান।
অত্র আলোচনায় শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা নগরীর বিকাশ নদীকে ঘিরে হলেও আজ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা মারাত্মক সংকটে পড়েছে। একসময় এ নদীগুলো ছিল শহরের প্রাণশক্তি, কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নদীতে প্রতিদিন বিপুল শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা, প্লাস্টিক ও নৌযানের তেল-রাসায়নিক প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে এবং দূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রায় শূন্যে নেমে গেছে এবং বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড অত্যন্ত বেড়ে গেছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী এবং নদীর পানি সম্পূর্ণ অনুপযোগী করে তুলেছে।
তিনি আরো বলেন, এই দূষণ জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে—ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস থেকে শুরু করে ক্যান্সার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি পর্যন্ত ঘটছে। মাছ ও জীববৈচিত্র্য বিলীন হয়ে নদীর ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা নেই। যদিও বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, পানি আইন ২০১৩, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩ এবং পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২১-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে, তবুও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ঢাকার নদীগুলোকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা, প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস, নিয়মিত নদী খনন ও দখল উচ্ছেদ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায়, একসময় যে নদীগুলো ঢাকার প্রাণশক্তি ছিল, সেগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাসের অংশ হিসেবেই টিকে থাকবে।
এইসকল সংকট নিয়ে আমাদের সচেতন হওয়া ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতাই ঢাকাকে একটি বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে পারে।
সবশেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্যদিয়ে চক্রটি সমাপ্ত হয়।